03/08/2026
মুখ বন্ধ করার পঞ্চাশ লক্ষ টাকা
_________
পঞ্চাশ লক্ষ টাকা।
তিনটে ফিক্সড ডিপোজিট। দুটো রেকারিং। মাধবীর এগারো ভরি সোনা। অমল সেনের সাতাশ বছরের প্রভিডেন্ট ফান্ড, বোনাস, ইনক্রিমেন্ট, কিপটেমি, বেড়াতে না যাওয়া, ভালো জামা না কেনা এবং প্রতিটি মাসের শেষে নিজেকে বোঝানো—
এখন নয়। পরে।
মেয়ের বিয়ের সময়।
শুক্রবার সংগীত। শনিবার বিয়ে। রবিবার রিসেপশন। সোমবার সকাল থেকে বাসি রজনীগন্ধা, প্লাস্টিকের জলের বোতল, ক্যাটারারের বকেয়া বিল, গয়নার লকার আর আত্মীয়দের পোস্ট-মর্টেম—
মাটনটা একটু শক্ত ছিল।
ফিশফ্রাইয়ে ভেটকি ছিল তো?
মেয়েকে গয়না কম দিয়েছে।
জামাইয়ের গাড়িটা নিজের না কোম্পানির?
অমলবাবু জানতেন, মানুষের মুখ বন্ধ করা যায় না। তবুও চেষ্টা করছিলেন। মানুষ যে কাজ অসম্ভব জানে, প্রায়ই জীবনের সবচেয়ে বেশি টাকা সেই কাজেই খরচ করে।
পঞ্চাশ লক্ষ টাকা তাঁর কাছে বিয়ের বাজেট নয়।
সাতাশ বছরের সোশ্যাল রিভেঞ্জ ফান্ড।
অন্বেষা দিল্লিতে থাকে। ঊনত্রিশ বছর। একটা ফিনটেক কোম্পানিতে প্রোডাক্ট ম্যানেজার। ভাড়ার ফ্ল্যাট। মাসে মোটা বেতন। নিজের গাড়ি কেনেনি—উবারে কাজ চলে যায়। বিয়ের বিরুদ্ধে নয়, পুরুষের বিরুদ্ধেও নয়। তবে বিয়েকে মেয়েদের জীবনের ফাইনাল ডেস্টিনেশন বলা হলে তার মুখটা শক্ত হয়ে যায়।
সেদিন অফিস থেকে ফেরার সময় ক্যাবের পিছনের সিটে বসে একটা ভিডিয়ো করল।
চোখে বড় ফ্রেমের চশমা। মাথার পিছনে গাড়ির কালো সিট। বাইরে দিল্লির ভাঙাচোরা আলো।
—আমার বাবা-মা আমার বিয়ের জন্য প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ টাকা জমিয়েছেন। আত্মীয়দের দুদিন খাওয়ানো, হল, ডেকোরেশন, গয়না—সব মিলিয়ে টাকাটা শেষ। অথচ এই টাকা যদি ঠিকভাবে ইনভেস্ট করা হয়, তাহলে আমি হয়তো সারা জীবনের জন্য অনেক বেশি ফাইন্যান্সিয়ালি সিকিওর হতে পারি। বিয়ে করব। নিজের টাকায়, নিজের মতো করে করব। আমার বিয়ে কি আমার জীবন, না আমার বাবা-মায়ের স্টেটাস প্রেজেন্টেশন?
ভিডিয়ো আপলোড।
তারপর লাইক। শেয়ার। কমেন্ট।
প্রথম এক ঘণ্টায় পাঁচ হাজার। সন্ধের মধ্যে পঞ্চাশ হাজার। পরদিন সকাল হতে না হতেই ভাইরাল।
“সাহসী মেয়ে।”
“এই প্রজন্মই ভারতকে বদলাবে।”
“সব বাবা-মাকে দেখানো উচিত।”
“মেয়েকে গয়না নয়, ফাইন্যান্সিয়াল ফ্রিডম দিন।”
অন্বেষা বারবার স্ক্রিনটা টেনে নামাচ্ছিল। নতুন কমেন্ট। নতুন প্রশংসা। নতুন নোটিফিকেশন।
শুরুতে সে একটা যুক্তি বলেছিল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেই যুক্তির সঙ্গে অহংকার মিশে গেল। মন্দ অহংকার নয়—নৈতিক অহংকার। টাকার অহংকারের চেয়েও এটা শক্তিশালী। টাকা থাকলে মানুষ নিজেকে ধনী ভাবে; নৈতিক হাততালি পেলে নিজেকে উন্নত মানুষ ভাবে।
মানুষ নিজের অহংকারকে সবসময় অহংকার বলে চিনতে পারে না।
অনেক সময় তার নাম দেয় আদর্শ।
পরদিন সকাল এগারোটায় ভিডিয়োটা সেন পরিবারের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পৌঁছল।
বড় শ্যালক লিখলেন—
“অমল, এ কি তোমাদের মেয়ে?”
তার নিচে তিনটে হাসির ইমোজি।
পিসতুতো দাদা লিখলেন—
“অতিরিক্ত স্বাধীনতা দিলে এটাই হয়।”
আর একজন—
“বাবা-মায়ের ত্যাগ আজকালকার ছেলেমেয়েরা বোঝে না।”
অমলবাবু অফিসের পুরোনো ল্যাপটপে ভিডিয়োটা তিনবার দেখলেন। অন্বেষা কী বলছে, সেটা প্রথমবার কানে ঢুকল না। দ্বিতীয়বারও না।
তাঁর মাথায় শুধু একটা বাক্য—
স্টেটাস প্রেজেন্টেশন।
মেয়ে পঞ্চাশ লক্ষ টাকার সমালোচনা করছে না। সাতাশ বছর ধরে তিনি যে মানুষটা হয়ে উঠেছেন, তাকেই অর্ধশিক্ষিত, আত্মপ্রচারকারী, ইললজিক্যাল বাবা বলে ডিজিটাল বাজারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
চোখে আগুন এল না।
বরং বুকটা ঠান্ডা হয়ে গেল।
অপমানের আগুনের আগে একটা ঠান্ডা স্তর থাকে। যেখানে মানুষ রাগ করে না। শুধু মনে মনে হত্যার দৃশ্য সাজায়—কখনও অন্যকে, কখনও নিজেকে, কখনও সম্পর্কটাকে।
সেই রাতেই অন্বেষা কলকাতার বাড়িতে এল।
ডাইনিং টেবিলে ভাত। মুসুর ডাল। আলুভাজা। কাতলার ঝোল। তিনজন মানুষ।
কথা নেই।
মাধবী ভাত বাড়ছিলেন। অমলবাবু মাছের কাঁটা আলাদা করছিলেন। অন্বেষা ফোনটা উলটে টেবিলে রেখেছিল। যেন স্ক্রিনটা দেখা গেলেই বাড়িতে আগুন লেগে যাবে।
অমলবাবু বললেন—
—আমাদের কথাটা সারা পৃথিবীকে না জানালে চলছিল না?
—আমি তো কোনও মিথ্যে বলিনি।
—সব সত্যি কথা বাজারে দাঁড়িয়ে বলতে হয়?
—বাজার নয় বাবা। একটা সামাজিক সমস্যা নিয়ে বলেছি।
—আমরা তোর বিয়ের জন্য টাকা জমিয়েছি, সেটা সামাজিক সমস্যা?
—টাকা জমাওনি, বাবা। একটা অনুষ্ঠান জমিয়েছ।
—অনুষ্ঠানটা কার?
—তোমাদের।
—বিয়ে তোর, অনুষ্ঠান আমাদের?
—হ্যাঁ। কারণ সেখানে আমি একটা প্রোডাক্ট। আমাকে সাজিয়ে দেখানো হবে—দেখুন, সেনবাবু মেয়ের বিয়েতে কী করেছেন।
অমলবাবুর হাত থেকে চামচ পড়ে গেল।
টং।
অতি সামান্য শব্দ। কিন্তু কোনও কোনও পরিবারে একটা চামচ পড়ার শব্দ বোমার থেকেও বেশি ধ্বংস করে।
—আমরা তোর শত্রু?
—আমি তা বলিনি।
—ভালো হল বুক করব। ভালো গয়না দেব। আত্মীয়দের খাওয়াব। এগুলো শত্রুতা?
—আমার ভালো থাকার সঙ্গে আটশো লোকের পোলাও খাওয়ার সম্পর্কটা কোথায়?
—সমাজে থাকতে হয়।
—সমাজ কি আমার ইএমআই দেবে? চাকরি চলে গেলে ভাড়া দেবে? বিয়ে খারাপ হলে সেই আটশো লোকের মধ্যে কজন দরজা খুলবে?
অমলবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর গলা নিচু করে বললেন—
—তুই নিজের পায়ে দাঁড়াবি। খুব ভালো কথা। তারপর?
—তারপর কী?
—দাঁড়িয়ে করবি কী?
অন্বেষা তাকাল।
—মানে?
—শেষ পর্যন্ত তো সংসার করতে হবে। বিয়ে হবে। সন্তান হবে। মানুষ কি শুধু নিজের জন্য দাঁড়ায়? একটা ফ্ল্যাট, একটা ব্যাঙ্ক ব্যালান্স, অফিস থেকে ফিরে অনলাইনে খাবার—এটাই জীবন? অসুখ হলে ব্যাঙ্ক ব্যালান্স তোকে জল খাওয়াবে?
—তুমি বলতে চাইছ স্বনির্ভর হওয়াটাও বিয়ের প্রস্তুতি?
—আমি বলছি মানুষের জীবনে পরিবার লাগে।
—মানুষের, না শুধু মেয়েদের?
—মেয়েদের জীবনে বিয়েটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
—ছেলেদের নয়?
—তাদেরও। তবে মেয়েদের—
—বাক্যটা শেষ কোরো না বাবা।
অন্বেষার গলাটা শক্ত। চোখের কোণে জল নেই। জল পরে আসে। অপমান আগে শরীরকে পাথর করে।
—শেষ করলে বুঝব, এত বছর আমাকে মানুষ করার জন্য পড়াওনি। একটু বেশি শিক্ষিত পাত্রী বানানোর জন্য পড়িয়েছ।
—এ কী কথা!
—ঠিক কথা। আমি চাকরি করব যাতে বিয়ের বাজারে আমার দাম বাড়ে। নিজের পায়ে দাঁড়াব যাতে ভালো ছেলে পাই। ভালো ছেলে পেয়ে সন্তান জন্ম দেব। তারপর সেই সন্তানকে আবার দাঁড় করাব—যাতে সেও বিয়ে করে সন্তান জন্ম দিতে পারে। এই সার্কুলার বিজনেস মডেলের শেষ কোথায়?
—পরের প্রজন্মে।
—আর আমার নিজের জীবন?
—তুই কি ভাবিস সন্তান হলে নিজের জীবন থাকে না?
—থাকে। কিন্তু সেটা আমি ঠিক করব। জন্মের আগেই আমার জীবনটা নেক্সট জেনারেশনের নামে ফিক্সড ডিপোজিট করে রেখো না।
অমলবাবু এবার গলা তুললেন—
—তা হলে আমরা এত কিছু করলাম কিসের জন্য?
—এই প্রশ্নটাই সমস্যা, বাবা। আমার জন্য যা করেছ, তার রিটার্ন আমার জীবন দিয়ে চাইবে কেন?
—আমরা রিটার্ন চাইছি?
—চাইছ। তোমাদের পছন্দের সময় বিয়ে, পছন্দের অনুষ্ঠান, পছন্দের সামাজিক ছবি। শুধু টাকার রিটার্ন নয়। অবিডিয়েন্সের রিটার্ন।
মাধবী ভাত বাড়ানো বন্ধ করলেন।
অমলবাবু বললেন—
—আমাদের যা কিছু, সব তোর।
—সেটাই তো ভয়। তোমাদের সব যদি আমার হয়, তাহলে আমার সবকিছুও তোমাদের হয়ে যায়।
মাধবী এতক্ষণ চুপ ছিলেন।
সংসারে কিছু নারী শান্তি রক্ষা করতে করতে নিজের মতামতটাকেই হত্যা করেন। তারপর সেই মৃত মতামতের উপর ভাতের হাঁড়ি বসিয়ে সংসার চালান। মাধবীও তাই করেছেন।
সেদিন হাঁড়িটা নামালেন।
—অন্বেষা, ভিডিয়োটা করার আগে আমাদের বলা উচিত ছিল।
অন্বেষা মাথা নিচু করল।
—হ্যাঁ। উচিত ছিল।
মাধবী এবার স্বামীর দিকে তাকালেন।
—আর তোমারও ওকে জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল, ও কেমন বিয়ে চায়।
—আমি কি ওর খারাপ চাইছি?
—মানুষ সবসময় খারাপ চেয়ে অন্যের জীবন নষ্ট করে না। নিজের মতো করে ভালো চাইতে গিয়েও করে।
অমলবাবু স্ত্রীর দিকে তাকালেন। তেত্রিশ বছরের বিবাহিত জীবন। এই গলার স্বর তিনি আগে শোনেননি।
মাধবী বললেন—
—আমার বিয়ের সময় বাবা জমি বন্ধক রেখেছিল, মনে আছে?
—এখন পুরোনো কথা কেন?
—কারণ সেই ধার শোধ করতে গিয়ে আমার ভাইয়ের কলেজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমার গানের স্কুলও। বিয়েতে চার রকম মাছ ছিল। সবাই বলেছিল, রাজকীয় বিয়ে। কিন্তু সেই রাজত্বের প্রজা ছিলাম আমরা। দাম দিয়েছিলাম আমরা।
—তুমি কি আমার সংসারে অসুখী?
—অসুখী না হওয়া আর নিজের জীবনটা পাওয়া এক কথা নয়, অমল।
এই একটিমাত্র বাক্য অমলবাবুর তেত্রিশ বছরের বিবাহিত জীবনের ব্যালান্স শিট উলটে দিল।
তিনি মাধবীকে ভালোবাসেননি—এমন নয়।
কিন্তু অধিকাংশ পুরুষ যেমন ভালোবাসে, তিনিও তেমনই ভালোবেসেছেন। নিজের প্রয়োজনের আকারে নারীটাকে কেটে নিয়ে। যতটুকু স্ত্রী, ততটুকু দেখা। যতটুকু মা, ততটুকু সম্মান। তার বাইরে যে একটা আলাদা মানুষ—তার গান ছিল, রাগ ছিল, ব্যর্থতা ছিল, শরীরের বাইরে একটা স্বাধীন সত্তা ছিল—সেটা দেখার সময় কোথায়?
অফিস। ইএমআই। মেয়ের স্কুল। আত্মীয়। ভবিষ্যৎ।
ভবিষ্যতের জন্য বাঁচতে বাঁচতে মানুষ বর্তমানের কতগুলো মানুষকে নিঃশব্দে মেরে ফেলে।
তার হিসেব কোনও ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্টে ওঠে না।
অমলবাবুর পঞ্চাশ লক্ষ টাকার নীচে শুধু স্টেটাস ছিল না।
একটা পুরোনো অপমানও ছিল।
বয়স তখন বাইশ। দিদির বিয়ে। মাছের মাথা কম পড়েছিল। বরের এক কাকা সবার সামনে বলেছিলেন—
—সেনদের সামর্থ্য এতটুকু? তা হলে এত বড় ঘরে সম্বন্ধ করতে এল কেন?
অমলের বাবা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিলেন।
কিছু বলেননি।
অমল সেই মাথা কোনওদিন ভুলতে পারেননি।
চাকরি পাওয়ার পর নিজের মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন—তাঁর মেয়ের বিয়েতে কিছু কম হবে না। এমন বিয়ে দেবেন, যাতে সেই মৃত কাকাটিও কবর থেকে উঠে এলে কথা খুঁজে না পায়।
অর্থাৎ অন্বেষার বিয়ে আসলে অন্বেষার বিয়ে ছিল না।
অমলের দরিদ্র যৌবনের আপিল মামলা।
ফিক্সড ডিপোজিট ছিল প্রমাণপত্র। গয়না সাক্ষী। পাঁচতারা হল বিচারসভা। আর আটশো অতিথি জুরি।
মেয়ের গায়ে হলুদের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি নিজের মৃত বাবার নিচু মাথাটা একবার তুলতে চেয়েছিলেন।
অন্বেষা সেই আদালতটাই বাতিল করতে চাইছিল।
প্রতিক্রিয়াশীলতা সবসময় ধর্মগ্রন্থ, পতাকা অথবা রাজনৈতিক বক্তৃতা হাতে আসে না। কখনও আসে মেয়ের বিয়ের এক্সেল শিটে। মানুষ যে সমাজের হাতে অপমানিত হয়, শেষ পর্যন্ত সেই সমাজের নিয়মকেই নিরাপত্তা বলে আঁকড়ে ধরে।
কারণ নতুন নিয়মকে সত্যি বলে মেনে নিলে পুরোনো জীবনের অনেকখানি ভুল বলে স্বীকার করতে হয়।
নিজের বিশ্বাস ভুল—মানুষ এটা মানতে পারে।
নিজের সাতাশ বছর ভুল—এটা মানা প্রায় মৃত্যুর সমান।
অমলবাবু ধীরে বললেন—
—তুই জানিস না, এই টাকা কীভাবে জমেছে।
—জানি বাবা।
—জানিস না। তোর স্কুলের ফি দিতে আমি নিজের দাঁতের চিকিৎসা পিছিয়েছি। তোর কলেজের সময় আমরা কোথাও বেড়াতে যাইনি। তোর মা নিজের জন্য কিছু কেনেনি। এই টাকার মধ্যে আমাদের জীবন আছে।
অন্বেষা বলল—
—সেই জন্যই তো বলছি, তোমাদের জীবনের সাতাশ বছর আড়াই দিনে পুড়িয়ে দিও না।
—পুড়িয়ে দিচ্ছি না। তোকে দিচ্ছি।
—আমাকে দিলে আমার ভবিষ্যৎকে দিতে। আমার চার ঘণ্টার সাজকে নয়।
অমলবাবু হঠাৎ হাসলেন।
—তুইও কি শুধু ভবিষ্যতের কথাই ভাবছিস?
—মানে?
—ভিডিয়োটা কেন করলি? আমাকে বোঝাতে? না লক্ষ লোককে দেখাতে যে তুই খুব আধুনিক?
অন্বেষা চুপ।
—আমি আত্মীয়দের সামনে তোকে সাজিয়ে দেখাতে চেয়েছি। তুই তোর ফলোয়ারদের সামনে আমাকে খুলে দেখালি। আমার স্টেটাস অফলাইনে। তোরটা অনলাইনে। দর্শক শুধু বদলেছে।
অন্বেষার মুখটা নেমে গেল।
কথাটা মিথ্যে নয়।
সে স্বাধীনতা চেয়েছে। কিন্তু সেই স্বাধীনতার ঘোষণায় হাততালিও চেয়েছে। বাবার পাঁচতারা হল আর তার ভাইরাল ভিডিয়ো—দুটোর ভিতরেই অচেনা মানুষের চোখের প্রয়োজন।
মানুষ বলে, সে অন্যের কথা ভাবে না।
তারপর পোস্ট করে।
লাইক গোনে।
রাতে উঠে আবার গোনে।
—ভিডিয়োটা আগে তোমাদের সঙ্গে কথা না বলে করা ঠিক হয়নি—অন্বেষা বলল—আমি সরি। কিন্তু আমার কথাটা ভুল নয়।
—আমার কথাটাও পুরো ভুল নয়। মানুষ শুধু টাকা নিয়ে বাঁচে না।
—আমি তা বলিনি। আমি একা থাকতে চাই তাও বলিনি। আমি শুধু ভয় থেকে বিয়ে করতে চাই না। বয়স চলে যাচ্ছে, লোক কী বলবে, সন্তান না হলে জীবন ব্যর্থ—এই ভয়ে নয়। কাউকে চাইলে বিয়ে করব। সন্তান চাইলে নেব। কিন্তু আমার স্বাধীনতাকে সংসারের প্রি-পেইড কার্ড ভেবো না।
—তা হলে বাবা-মায়ের ভূমিকা কী?
—আমি পড়ে গেলে পাশে দাঁড়ানো।
—পাশে দাঁড়ানোও তো একধরনের অধিকার।
—হ্যাঁ। কিন্তু পাশে দাঁড়ানো আর সামনে দাঁড়িয়ে রাস্তা আটকানো এক নয়।
রাতে কেউ ঘুমোল না।
অমলবাবু পুরোনো ফাইল খুললেন। ফিক্সড ডিপোজিটের রসিদ। এলআইসি। সোনার বিল। সম্ভাব্য বিয়ের বাজেট।
“ব্যাঙ্কোয়েট—সাড়ে সাত লক্ষ।”
“ক্যাটারিং—বারো লক্ষ।”
“ডেকোরেশন—চার লক্ষ।”
“ফটোগ্রাফি—দুই লক্ষ।”
দুই লক্ষ টাকার ছবি।
যে বিয়ে হয়তো দশ বছর পরে দুজনেই দেখতে চাইবে না, তার ছবির জন্য দুই লক্ষ। অথচ মাধবীর গানের স্কুলের মাসিক ফি ছিল একশো কুড়ি টাকা। তখন দেওয়া হয়নি।
জীবনের অঙ্ক অদ্ভুত। যেখানে একশো কুড়ি টাকা বাঁচানো হয়, সেখানেই পরে দুই লক্ষ টাকা পুড়িয়ে মানুষ প্রমাণ করতে চায়—সে সফল।
পাশের ঘরে অন্বেষা নিজের ভিডিয়োর কমেন্ট দেখছিল।
কেউ লিখেছে—
“মেয়েটা বাবা-মাকে অপমান করেছে।”
কেউ—
“বিয়ে না করে বুড়ো বয়সে বুঝবে।”
কেউ তার চেহারা নিয়ে মন্তব্য করেছে। কেউ চরিত্র নিয়ে। কেউ লিখেছে—
“এদের স্বাধীনতা মানে লিভ-ইন আর ডিভোর্স।”
অন্বেষা স্ক্রিন বন্ধ করল।
যে জনতাকে সাক্ষী করে সে বাবার বিরুদ্ধে যুক্তি দিয়েছিল, সেই জনতাই এখন তার বিচারক। ডিজিটাল জনতা পাঁচতারা বিয়ের আত্মীয়দের চেয়ে আলাদা নয়। দুজনেই বিনা নিমন্ত্রণে জীবন পরীক্ষা করে। শুধু একজন মাটন খেয়ে বদনাম করে, অন্যজন ডেটা খরচ করে।
মাধবী আলমারির উপর থেকে পুরোনো হারমোনিয়ামের বাক্সটা নামালেন।
ধুলো।
একটা রিডে চাপ দিলেন।
বেসুরো শব্দ।
তবুও শব্দ।
মৃত নয়।
পরদিন অমলবাবু ব্যাঙ্কে গেলেন।
ম্যানেজার কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে বললেন—
—পঞ্চাশ লক্ষের আমানতটা তো আগামী মাসে ম্যাচিওর করছে। কন্যার বিবাহ?
অমলবাবু এতদিন এই প্রশ্নের উত্তর গর্ব করে দিতেন।
আজ একটু থামলেন।
—কন্যার ভবিষ্যৎ।
ম্যানেজার মাথা তুললেন না। তাঁর কাছে দুই কথার মধ্যে পার্থক্য নেই। দুটোই কাস্টমার রিলেশনশিপ ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যারের একই ড্রপডাউন মেনুতে পড়ে।
কিন্তু অমলবাবুর কাছে পার্থক্যটা সাতাশ বছরের।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে বললেন—
—তোর ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যানটা দেখাবি।
অন্বেষা চমকাল।
—পুরো টাকাটা?
—এত তাড়াতাড়ি খুশি হোস না। আমি এক রাতে আধুনিক হয়ে যাইনি।
—তা হলে?
—টাকার একটা অংশ তোর নামে দীর্ঘমেয়াদি ইনভেস্টমেন্ট হবে। একটা অংশ তোর মায়ের নামে। কিছু আমাদের মেডিক্যালের জন্য। আর কিছু—
—বিয়ের জন্য?
—হ্যাঁ।
অন্বেষা হেসে ফেলল।
—আমি নিজের টাকায় করব।
—তুই করবি। আমিও কিছু দেব।
—কেন?
অমলবাবু চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন—
—বাবা হওয়া বন্ধ করতে পারব না। শুধু তোর জীবনের ডিরেক্টর হওয়া বন্ধ করার চেষ্টা করতে পারি।
মাধবী পাশ থেকে বললেন—
—আর আমার গানের ক্লাস?
অমলবাবু স্ত্রীর দিকে তাকালেন।
—কাল থেকেই ভর্তি হয়ে যাও।
—এই বয়সে?
—এই কথাটাই তো আমরা অন্বেষাকে এতক্ষণ ধরে বলছিলাম—কোনও কিছুর বয়স চলে যায়।
মাধবী হেসে বললেন—
—তুমি বলছিলে। আমি না।
এক বছর পরে অন্বেষা দুই বন্ধুকে নিয়ে একটা ছোট কোম্পানি শুরু করল।
তিন কামরার অফিস। ছয়জন কর্মী। পুরোনো টেবিল। সেকেন্ডহ্যান্ড চেয়ার। দেওয়ালে হোয়াইটবোর্ড। কোনও ঝাড়বাতি নেই। ফুলের গেট নেই। প্রবেশপথে সানাই নেই।
তবুও উদ্বোধনের দিন দেখা গেল অমলবাবু সিল্কের পাঞ্জাবি পরে এসেছেন। আত্মীয়দের ডেকেছেন। প্রয়োজনের তুলনায় তিনগুণ মিষ্টি এনেছেন। প্রত্যেককে বলছেন—
—ওদের কোম্পানির প্রথম বছরের রেভিনিউ টার্গেট জানেন?
আগে তিনি সম্ভাব্য জামাইয়ের স্যালারি বলতেন।
এখন মেয়ের রেভিনিউ বলেন।
মানুষ খুব কমই স্টেটাসের লোভ ছাড়ে। সৌভাগ্য হলে শুধু স্টেটাসের বিষয়টা বদলে যায়।
এক আত্মীয়া অন্বেষাকে আশীর্বাদ করে অমলবাবুর কানে বললেন—
—সবই তো হল। বিয়েটা কবে দিচ্ছ?
অমলবাবু একটু থামলেন।
—ওকে জিজ্ঞেস করুন।
—বাবা হয়ে আপনার কোনও মত নেই?
—মত আছে। ভেটো নেই।
আত্মীয়া সন্তুষ্ট হলেন না। পাশের টেবিলে গিয়ে বললেন—
—মেয়ে বেশি রোজগার করলে বাবা-মায়ের কথা শোনে না।
অমলবাবু শুনতে পেলেন।
আগে হলে বুকের ভিতরটা জ্বলে উঠত। এবারও উঠল। মানুষ এক বছরে বুদ্ধ হয়ে যায় না। তবে আগুনটা কিছুক্ষণ পরে নিজেই নিভে গেল।
সাতাশ বছর ধরে যে মুখগুলো বন্ধ করার জন্য তিনি পঞ্চাশ লক্ষ টাকা জমিয়েছিলেন, সেদিন বুঝলেন—সমাজের মুখ একটা ওভারড্রাফট অ্যাকাউন্ট। যতই জমা দাও, সুদসহ নতুন অপমান ফেরত দেয়।
অন্বেষা দূরে দাঁড়িয়ে বাবাকে দেখছিল।
তার কোম্পানির উদ্বোধনের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় উঠেছে। প্রতি মিনিটে লাইক বাড়ছে। সে একবার ফোনটা বের করল। সংখ্যা দেখল। তারপর নিজের অজান্তেই আবার রিফ্রেশ করল।
বাবা আত্মীয়দের হাততালি চান।
মেয়ে ফলোয়ারদের।
দুজনের অসুখ পুরো সারেনি।
শুধু রোগ নির্ণয় হয়েছে।
গ্রুপ ফটোর সময় অমলবাবু অভ্যাসমতো সামনে এসে দাঁড়ালেন। অন্বেষা তাঁর হাত ধরে পাশে টেনে নিল।
—এখানে, বাবা। আমার পাশে।
ক্যামেরা ক্লিক করল।
পঞ্চাশ লক্ষ টাকা খরচ হয়নি। মানুষের মুখও বন্ধ হয়নি। অন্বেষা পুরো জেতেনি। অমলবাবুও পুরো হারেননি।
হয়তো সেই কারণেই সম্পর্কটা বেঁচে গেল।
মানুষ পুরো বদলায় না।
তার জেদের জ্যামিতি সামান্য বদলে যায়—সামনে থেকে পাশে।
মানবসভ্যতার অগ্রগতি অনেক সময় এটুকুই।