17/07/2026
#মহানায়কের_স্মৃতিচারণায়_ভ্রাতৃবধূ_সুব্রতা_চট্টোপাধ্যায়।
মহানায়ক তাঁর কাজের জায়গায় কখনও শ্রেষ্ঠত্বের নীচে নামতে জানতেন না। সংসারেও তাঁর ভূমিকা ছিল সেরা। অভিভাবকত্ব, বন্ধুত্ব,কর্তব্য পালন..প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর ভূমিকা ছিল শ্রেষ্ঠতম।তাঁকে কেন্দ্র করে আমার ব্যক্তিগত ভাবনাচিন্তা বরাবরই কিছুটা গর্বমিশ্রিত।পারিবারিক জীবনে আমি শুধু তাঁর ভ্রাতৃবধূ হিসেবেই পরিচিত ছিলাম না,ঘরে বাইরে তাঁর খুব কাছের মানুষ হওয়ার মত সৌভাগ্যও আমার হয়েছিল।
তাঁর সঙ্গে আক্ষরিক অর্থে আমার পরিচয় ঘটে ১৬ বছর বয়সে। আমি তখন ওঁর ছোট ভাইয়ের প্রেমে মশগুল হলেও,অনেকখানি কৌতুহল আর মুগ্ধতা ঘিরে ছিল উত্তমকুমারকে
নিয়েই।বুড়োকে বলতাম "আমাকে একটু উত্তমকুমারদার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দাওনা।"এরপরই হঠাৎ একদিন বুড়ো এসে বলল,"দাদা তোমাকে গ্র্যান্ডে ডেকেছে,আলাপ করবে। " একে জীবনে প্রথম গ্র্যান্ডে ঢোকার সৌভাগ্য...
তার উপর ডাক দিয়েছেন উত্তমকুমার স্বয়ং! একটা ষোল বছরের মেয়ের যে কি মানসিক অবস্থা হতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়।
সকাল থেকেই বুকের ধুকপুকানি... হাত পা টলমল।সব থেকে পছন্দের শাড়িটা বের করে
নিজেকে সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়ে অপেক্ষা করে রইলাম প্রার্থিত সময়ের জন্য।
অবশেষে পৌঁছলাম গ্র্যান্ডে।উনি আমায় হলের
একপ্রান্তে ডেকে নিয়ে গেলেন একান্তে। বললেন"বুড়োকে ভালোবাসো?বিয়ে করবে? আমার আপত্তি নেই.." উনি কিছু বলছেন ঠিকই, শুনছিও,কিন্তু মস্তিষ্কে পৌঁছচ্ছেনা।আমি তখন মুগ্ধ চোখে শুধু চেয়ে দেখছি এক বিপুল জনপ্রিয় নায়ককে...উনি তখনও বলে চলেছেন"বিয়ের পর ছবিতে কাজ করবে,যদি তোমার ভালো লাগে, তোমার যদি প্রতিভা থাকে,নিশ্চয়ই কোরো। আমার আপত্তি নেই।"আমি তখনও নির্বাক, হিপনোটাইজড! মনে হচ্ছে এইমানুষটার
সান্নিধ্য পাওয়ার চেয়ে আমার প্রতিভা খুব দামি কি?
চেতনা ফিরল ওনার মৃদু ধমকে,"তুমি কি আমার। কথা শুনছ? উত্তর দিচ্ছনা কেন?"যদিও এই ঘটনার আগেই আমরা লুকিয়ে রেজিস্ট্রি করেছিলাম। তবুও দাদা আবার দারুণ ঘটা করে আমাদের বিয়ে দিলেন। খুব সুন্দর একটা বেনারসি আর জমকালো নবরত্নের সেট দিয়ে আশীর্বাদ করেছিলেন আমায়। আস্তে আস্তে ওঁর অনেক কাছের মানুষ হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু ওঁর নায়কোচিত মোহজাল থেকে কখনও নিজেকে মুক্ত করতে পারিনি।ওঁর কথাবলা,চাউনি,হাসি, হাঁটাচলা..সবকিছুর মধ্যেই পরদার উত্তমকুমারের ছায়া দেখতে পেতাম।
দাদা যখন গরদের জোড় পরে লক্ষ্মীপূজার আসনে বসে হাতজোড় করে মন্ত্র উচ্চারণ করতেন তখন ঠিক যেন 'স্ত্রী' ছবির মাধব দত্ত।আমার দাদা আর মহানায়ক কোথায় যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত। এই মোহজাল, এই বিভ্রম দাদার খুব কাছের মানুষদের সঙ্গেও কোথায় যেন একটা অদৃশ্য দূরত্ব তৈরী করে দিত।খুব সূক্ষ্ম একটা বিভাজন,যা বুঝিয়ে বলা যায়না,শুধু অনুভব করা যায়। এই অনুভূতি দাদার মধ্যেও একটা সূক্ষ্ম অভিমান তৈরি করে দিয়েছিল।
এরপর..এল সেই ভয়ংকর দিন।দাদা বেলভিউয়ে।দিদিভাই বাড়ি ফিরে এলেন...গা ভর্তি গয়না, মাথা ভর্তি সিঁদুর। বলেন' আমি ঘুমোব।" আমি টিভি চালিয়ে চুপচাপ বসে।দেখছিনা কিছুই।হঠাৎ পর্দায় ভেসে উঠল ছবির গানের দৃশ্য, 'বিষ্ণুপ্রিয়া গো,তুমি থাক ঘুমঘোরে আমি চলে যাই।' বুকের মধ্যে কেমন করে উঠল।এরপর পরই বেজে উঠল ফোনটা!বুড়োর ফোন'দাদা আর নেই।'প্রচন্ড জোরে চেঁচিয়ে উঠেছিলাম আমি। দিদিভাইকে জাগিয়ে গেলাম নার্সিংহোমে।ততক্ষণে খবর ছড়িয়ে পড়েছে।এরপর দাদাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম আমরা।সারারাত দিদিভাই বসে রইলেন দাদার মাথার কাছে।আমি সারারাত আমার শখের বেডকভার বদলে বদলে বিছিয়ে দিলাম দাদার গায়ে।
সবাইকে লুকিয়ে রাত দুটোর সময় টেলিফোনে ডেকেছিলাম রমাদিকে।অনুনয় করেছিলাম "তোমাকে আজ আসতেই হবে।আর জীবনে কখনও আসতে বলবনা তোমাকে।আমার মেয়ের বিয়েতেও না। কিন্তু আজ তুমি একবার এস....শুধু একবার।তোমাকে আসতেই হবে।"
রমাদি এলেন...রাত সাড়ে তিনটে।হাতে সুগন্ধি মালা পায়ে দিতে যাচ্ছিলেন।দিদিভাই বললেন ,"পায়ে নয়,ওঁর গলায় পরিয়ে দাও,"উনি দাদার গলায় পরিয়ে দিতে দিতে খুব নীচু স্বরে বললেন"আমি হেরে গেলাম উত্তম।"আমার সেই চরম দু:খের মুহূর্তে মনে হল কোথাও যেন ক্যামেরা চলছে..একটি ছবির দৃশ্যগ্রহণ হচ্ছে।উত্তম সুচিত্রা জুটির শেষ ছবির।এইমাত্র উচ্চারিত হয়ে গেল সেই শেষ ছবির শেষ সংলাপ।
(কৃতজ্ঞতা স্বীকার- আনন্দলোক,২০ জুলাই ১৯৯১)