25/04/2024
চল্লিশের দশকের শুরুর দিকে তাবৎ দুনিয়ার অন্যতম সেরা ফুটবল দলে পরিণত হয় আর্জেন্টিনার 'রিভার প্লেট'। অভিভাবক কার্লোস পিউলেস গর্ব করে বলতেন,'আমাদের কৌশল প্রথাগত ১-২-৩-৫ নয়, বরং ১-১০'।
মুনোজ, মোরেনো, পেদেরনেরা, লাবুর্নাদের নিয়ে গড়া দুর্ধর্ষ রিভার প্লেটকে ডাকা হতো 'মেশিন'। বলা হয়, 'তাঁরা যখন মাঠে নেমে খেলতো তখন গোলাকার বলটা হয়ে যেত তাঁদের কাছে পোষা কুকুরের মতো, এ পোষা কুকুরটি কখনো গোলের জাল ছাড়া অন্য কোথাও জড়াতো না'
দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল পাড়ায় রিভার প্লেট তখন প্রতিপক্ষকে নিয়মকরে আটলান্টিকের ঢেউয়ের মতো এদিক-ওদিক আঁচড়ে ফেলত৷ রিভারপ্লেট থেকে উত্তাল আটলান্টিক মাড়িয়ে আমস্টারডামের দূরত্ব প্রায় হাজার কিলোমিটার। সত্তরের দশকে ডাচ দলটাকে বলা হতো 'ক্লকওয়ার্ক অরেঞ্জ'। রিভার প্লেটের মেশিন ফুটবলের মতো এরাও ফুটবল মাঠে ছিল অপ্রতিরোধ্য। তাঁরা এমনই সংগঠিত ছিল যে, মাঠে তারা প্রথাগত কৌশলকে তুড়ি মেরে এগারো জনই এক হয়ে যেত। ব্রাজিলের এক প্রতিবেদক এ দলটাকে বলে বসেন 'সংগঠিত অসংগঠন'।
ক্লকওয়ার্ক অরেঞ্জকে যদি বলা হয় আস্ত একটা সংগীত, তাহলে জোহান ক্রুইফ ছিলেন সেই সংগীতের মূল সুর। ফুটবল প্রেমিক বাবা কর্নেলিস ক্রুইফের স্বপ্ন ছিলছেলে শুধু দেশে নয়, দেশ ছাড়িয়ে তাবৎ দুনিয়ায় অরেঞ্জ বিপ্লব ঘটাবেন। একসময় বাবার সেই স্বপ্ন পরিণত হয় নিজের স্বপ্নে৷
সেই পরম কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের তাগিদে আমস্টাডামের পথে ঘাটে নিয়মকরে ফুটবল খেলতেন ক্রুইফ। ক্রুইফের বাল্য বেলার আইকন আরেক ডাচ ফুটবলার ফাস উইলক্স৷ উইলক্সের চোখধাঁধানো ড্রিবলিংয়ের মোহে আঁটকা পড়েন ক্রুইফ৷ বুকে জমা রাখতেন বাবার অরেঞ্জ বিপ্লবের স্বপ্ন, আর মাথায় চলতো ফুটবল প্রেম। ফুটবলের প্রতি ক্রুইফের গভীর অনুরাগ ও বল পায়ে কাঁড়িকুঁড়ির মুগ্ধতায় ফেঁসে যান তৎকালীন আয়াক্স তরুণ দলের কোচ জেনি ভ্যান ডের বীন। কোনো ট্রায়াল ছাড়াই আয়াক্স জুনিয়র টিমের খেলার বন্দোবস্ত হয়ে যায়। এরপরের গল্পের ক্রুইফ তো আস্ত এক সিনেমা।
১৯৫৭ থেকে ১৯৬৪ সাল। এর মাঝে কেটে গেছে সাতটি বছর। ফুটবলের প্রতি ক্রুইফের প্রেম এ সাত বছরে আরো শানিত হয়। ৬৪ সালের ১৫ই নভেম্বরের কোনো এক গোধূলি বেলায় জিভিয়েভির বিপক্ষের ম্যাচ দিয়ে আয়াক্স মূল টিমে ক্রুইফের অভিষেক হয়। স্বপ্নের প্রথমে পদক্ষেপে গোল পেলেও বিধাতার
খাতায় লেখা ছিল 'আয়াক্সের হার'। আয়াক্স ৩-১ ব্যাবধানে হেরে যায়। ১৯৬৪-৬৫ এ মৌসুম ছিল আয়াক্সের ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে মৌসুম। লিগে ১৩তম হয়ে মৌসুম শেষ করতে হয় আয়াক্সের। কিন্তু ক্রুইফ ছিলেন তাঁর স্বপ্ন নামক পরম আরাধ্যের নিয়মিত পূজারী৷ আয়াক্সের ভরাডুবির মৌসমেও তাঁর পা থেকে আসে ৯ ম্যাচে ৪ গোল। এরপর আয়াক্সের দৃশ্যপটেও তৈরি এক স্মরণীয় যাত্রা…
পুরোদমে টোটাল ফুটবল ট্যাক্টিকসের সাথে মিশেল এবং লেভকে নিয়ে আয়াক্সকে তাবৎ দুনিয়ার অন্যতম সেরা দল পরিণত করেন ক্রুইফ। ফলাফল ১৯৬৬-১৬৬৭ পর্যন্ত আয়াক্স টানা তিনবারের মতো লীগ জয় করে৷ এরপর ক্যালেন্ডারের পাতায় ১৯৭২ সাল আসার আগেই আয়াক্স ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্বের কাতারে নাম লেখায়। ১৯৭২ সালে আরেক ইতালীয় জায়ান্ট ইন্টার মিলানকে ২-০ গোলে হারিয়ে ২য় বারের মত ইউরোপিয়ান কাপ জয় করে আয়াক্স। এবং দুটো গোলই আসে ক্রুইফ নামক এক ডাচ দার্শনিকের পা থেকে। ম্যাচ শেষে ডাচ পত্রিকাগুলোর হেডলাইনে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা "টোটাল ফুটবলের সামনে ইতালির ডিফেন্সিভ ফুটবলের মৃত্যু''। কয়েকটি পত্রিকা আরো রায় দেয়,'ক্রুইফ একাই শুধু ইতালিয়া ইন্টার মিলানকে ফাইনাল থেকে ছুড়ে ফেলে দেয়।'
ক্রুইফের বার্সা অধ্যায়ে যোগ হয় নানা বিশেষণ ও কৃতিত্ব। ১৯৭৩ এর ডিসেম্বরে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে বার্সার ম্যাচ চলছিল। ম্যাচের এক পর্যায়ে ডি-বক্সের ডান সাইড থেকে ক্রস আসে, ঐ সময় বলের উচ্চতা ছিল ঘাসের ডগা থেকে মাদ্রিদ গোলকিপার মিগুয়েল রেইনার ঠিক বরাবর৷ ক্রুইফ বাতাসের বেগে লাফিয়ে উঠে ডান পা দিয়ে কিক করেন। বল রেইনাকে ফাঁকি দিয়ে খুঁজে নেয় নিজের ঠিকানা। যে গোলটিকে লোকে দরদ ভরা কন্ঠে ডাকে
"দি ফ্যান্টম গোল"।
পরবর্তীতে কাতালোনিয়ারা গোলটার নাম দেয় "Le but impossible de Cruyff" যার অর্থ হল "ক্রুইফের অসম্ভব গোল"। রাতারাতি ক্রুইফ বনে যান"the Flying Dutchman তথা এক উড়ন্ত ওলন্দাজ" নামে। এরপর বার্সার হয়ে ক্রুইফ নিজেকে নিয়ে যান সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাহিরে। বাবার সেই ছোটবেলার স্বপ্নকে আগলে রাখেন পরম যত্নে। দল ও নিজেকে নিয়ে যান ফুটবলীয় সাম্রাজ্যের এক অনন্য উচ্চতায়। পরিণত হন সমর্থকদের মুখের স্লোগানে। তাই তো ক্রুইফের লোকান্তর প্রাপ্তির দিনেও ৯০ হাজার বার্সা ফ্যান সমস্বরে বলে উঠে ''Gracies Johan'' বাংলায় যার তরজমা 'তোমাকে ধন্যবাদ, জোহান'
শুভ জন্মদিন Gracies Johan…..🧡