21/04/2025
লালমাই থিয়েটার -এর ১৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
স্মৃতির ফুলদানিতে প্রীতির সমারোহ...
সীমান্ত আকরাম
হাঁটি হাঁটি পা পা করে দেড় দশক অতিক্রম করল প্রাণের প্রিয় সংগঠন ‘লালমাই থিয়েটার’। সেদিনের ছোট্ট সংগঠনটি আজ বহুপথ পেরিয়ে গৌরব ও সম্মানের মুকুট মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়েছে এক যুগ ফূর্তি উৎসবে। এক যুগ তথা ১৫ বছর কম সময় নয়, একটা বিপ্লব বা একটা সাফল্য অর্জনের বয়সের সমান।
২০১০ সালের ২১ এপ্রিল বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (বার্ড) -এর নীলাচল পাহাড়ের চূড়ায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একঝাঁক তারুণ্যদীপ্ত মেধাবী ও সংস্কৃতিপ্রেমি ভাইদের নিয়ে পথচলা শুরু। একবুক স্বপ্ন নিয়ে সেই স্বপ্নের বীজ বপন করেছিলাম সেদিন। আজ তা পত্র-পল্লবে সুশোভিত এক বটবৃক্ষে রূপান্তরিত। সেদিন উপস্থিত থেকে যারা আমাদের অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন তার মধ্যেÑ নাসির আহমেদ মোল্লা, কামরুজ্জামান সোহেল, মাছুম বিল্লাহ, আনোয়ার হোসাইন, ডি এম সিদ্দিক ও শাহাদাত হোসাইন প্রমুখ। সেদিন আমাকে পরিচালক এবং ইংরেজি ২য় ব্যাচের দেলোয়ার হোসেনকে সহ-পরিচালক করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে আরো ছিলÑ জয়নাল আবেদিন রনি, আবদুল আজিজ, মিজান উদ্দিন জিসান, মোস্তাক আহমেদ শিবলু, মিজানুর রহমান সোহান, নাঈম হোসেন প্রমুখ।
কিছুদিনের মধ্যেই কোটবাড়ি অবস্থিত জনতা ব্যাংকের ৩য় তলায় একটা রুম নিয়ে থিয়েটারের কার্যক্রম শুরু করি। তখনকার সিটি কলেজের অধ্যক্ষ ইফতেখার আলম ভূইয়ার সাথে কথা বলে সিটি কলেজে আমাদের সাপ্তাহিক প্রশিক্ষণ ক্লাসের ব্যবস্থা করি। এরপর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, গর্ভ. ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, সিটি কলেজ, আইডিয়াল স্কুল, শালবন স্কুল, টিটিসি প্রভৃতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেও ভর্তি কার্যক্রম শুরু করি। ৫০ থেকে ৬০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে আমাদের নিয়মিত নাট্য, সঙ্গীত ও শিশু বিভাগের কার্যক্রম চলতে থাকে। শুরুর দিকে শহর থেকে এসে ক্লাস নিতেন বেলাল ভাই, আল আমিন, মহিন, জিয়া ভাই, জহির ভাই, মাঝে মাঝে শিল্পকলা একাডেমির প্রশিক্ষক রিফাত ভাইও কিছু ক্লাস নিয়েছিলেন। ঢাকা থেকে দিদারুল ইসলাম, মাহফুজ বিল্লাহ শাহী, রবিউল ইসলাম ফয়সাল, নবাব নাসির, মনির হোসেন, মঈন উদ্দিন বকুল ভাইরা কুমিল্লায় সফরে এলে তাদের সাথে যোগাযোগ করে ক্লাসের ব্যবস্থা করতাম। নতুন সংগঠন হওয়ায় সবাই আমাদের গুরুত্ব দিতেন এবং সহযোগিতাও করতেন।
প্রথম বছরটি এভাবেই কাটলো এবং এর মাঝেই একঝাঁক শিল্পী পেয়ে গেলাম। বড় বিভাগেÑ রনি, সৌরভ, শামীম, সোহেল, মুজাহিদ, মালেক, সাদ্দাম, ফারুক, বুলবুল, জিসান, আজিজ, মাহবুব, তানভীর, হানিফ, সোহান, আশিক। কিশোর বিভাগেÑ নাঈম, মিরান, ইকবাল, হানিফ, রাকিব, আকাশ, কাইয়ুম। শিশু বিভাগেÑ জিসান, কানন, মাছুম, জিকু, কাইয়ুম, কুইন, ফারিহা, অপি, নূপুর, সুমাইয়া, সোহান, নূরে আলম, সাকিব, নাঈম, সাইফ ও শুভ।
এরই মধ্যে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও প্রোগ্রামে সাংস্কৃতিক পরিবেশনার জন্য দাওয়াত আসতে লাগল। কর্পোরেট অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাহফিলে লালমাই থিয়েটারের নিয়মিত পরিবেশনা চলতে থাকল। আমার সময়ে আড়াই বছরে প্রায় ৩০টির মতো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছি। এছাড়াও থিয়েটারের আয়োজনে বিভিন্ন ইস্যুতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, দিবস পালন পাশাপাশি সামাজিক কার্যক্রমেও নব নব ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যÑ জিলা স্কুল অডিটোরিয়ামে বিজয় উৎসব (২০১১), ইনসাফ গার্ডেন সিটিতে বাংলা বর্ষবরণ উৎসব (২০১২), শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান (২০১২), কুমিল্লা টাউনহল মিলনায়তে মল্লিক সন্ধ্যা (২০১৪), বিভিন্ন টিভি শোগুলোতে অংশগ্রহণ, বার্ষিক শিক্ষা সফর, পহেলা বৈশাখ, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসগুলোতে বর্ণাঢ্য র্যালি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পথশিশুদের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ ইত্যাদি নানা কার্যক্রমগুলো ছিল আমাদের নিয়মিত কাজের অংশ। এ কাজগুলো পরিচালনা করতে গিয়ে যাদের সহযোগিতা পেয়েছিলাম তাদের মধ্যেÑ ড. মাসুদুল হক চৌধুরী, শাহাদাত হোসাইন, আল আমিন ভূঁইয়া, ছফিউল্লাহ, খলিলুর রহমান, মোহাম্মদ ইসমাঈল, মাঈন উদ্দিন, আরিফুজ্জামান, হাবীব জীবন, শরীফ হোসেন, দেলোয়ার হোসেন, আবদুল কাদের, রবিউল হাসান প্রমুখ।
২য় বছরে আমাদের পরিকল্পনা ছিল ভিজুয়্যাল গানের অ্যালবাম, ২য় বর্ষপূর্তি উৎসব ও স্মারক প্রকাশ করা। অ্যালবামের জন্য গান সংগ্রহ, সুর সংগ্রহ, নিয়মিত রিহার্সেল, সসাসের সাথে যোগাযোগ ইত্যাদি কার্যক্রম অব্যাহত থাকল। নতুন সংগঠন হিসেবে সসাসের কাছ থেকে যথেষ্ট সহযোগিতা পেয়েছি। তখন সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলেন আবু নাছের ভাই। ভাই আমাদের অনেক সহযোগিতা করেছিলেন। অনেক ভুল-ভ্রান্তির পরও অ্যালবাম করার ক্ষেত্রে আমাদের সুযোগ দিয়েছেন। আমরা সসাসে গান জমা দিলাম। গান বাছাই করে রেকর্ডিং এর তারিখ নির্ধারণ হলো। শাহী ভাই, দিদার ভাই রেকর্ডিংয়ে আমাদের সময় দিয়েছেন। গান রেকর্ডিং শেষে শুটিং -এর পালা। প্রোডাকশনের সব দায়িত্ব নিলেন সসাসের মিডিয়া সম্পাদক নবাব নাসির ভাই। পরিকল্পনা অনুযায়ী শুটিং শুরু হলো। কুমিল্লার দর্শনীয় স্থানÑ বার্ড, শালবন বিহার, ইটাখোলা মুড়া, গোমতী নদী ইত্যাদি স্থানে সুটিং চলছে। ১ম দিন শুটিং ছিলো বার্ডে। দুপুরে আমাদের টিমের জন্য বাইরে থেকে খাবার প্রবেশ করতে দেয়নি বার্ড কর্তৃপক্ষ। কলা আর পাউরুটি খেয়ে সারাদিন থাকতে হয়েছে। সে খাবার খেয়েছি সন্ধ্যার পর। ২য় দিন শুটিং ছিল গোমতী নদীর পাড়ে। সেদিন শুক্রবার ছিল। সকালে ক্লাস করতে আসা অপি আর নূপুর জোর করে আমাদের টিমের সাথে চলে আসে শুটিং স্পটে। সারাদিন ব্যস্ত থাকায় ওদের পরিবারের সাথে আর যোগাযোগ হয়নি। আমাদের ফোনেও ওদের পরিবার থেকে যোগাযোগ করতে পারেনি। ওদের খোঁজ না পেয়ে দুই পরিবারের মধ্যে কান্নাকাটি শুরু হয়ে গেল। বিকেলে ওদের বাসায় পৌঁছে দিতে গেলে এই কাণ্ড দেখা যায়।
শুটিংয়ের আরেকটি ঘটনা। ‘মেঠোপথে সারি সারি’ গানের শুটিংয়ের জন্য চিত্রনাট্য করা হয়। চিত্রনাট্যে খেজুরগাছের নীচে রাখাল বসে বসে বাশি বাজাবে তারপর গান শুরু হবে। এ চরিত্রের জন্য রবিউলকে ঠিক করা হলো। কিন্তু বাশি পাই কই? ঐ গ্রামের এক মহিলা তার বাড়ি থেকে একটা বাশির ব্যবস্থা করে দিলো। পরিকল্পনা মাফিক চিত্রগ্রহণ করা হলো। দুঃখের বিষয় হলোÑ এডিটিংয়ের সময় সেই দৃশ্যটি আর পাওয়া যায়নি। যাক অবশেষে অ্যালবাম প্রকাশ হলো। এক্ষেত্রে আইসিএল এবং প্রিভেইল গ্রুফ আমাদের আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেছিলেন।
অ্যালবামের কাজ শেষ করে স্মারক প্রকাশে উদ্যোগ নিলাম। লেখালেখি সংগ্রহ শুরু করলাম। নতুন হিসেবে সবার সাথে যোগাযোগ করাও কষ্ট ছিল। তারপরও হাল ছাড়িনি। ঢাকায় গিয়ে প্রতিথযশা ব্যক্তিদের সাথে দেখা করে লেখা সংগ্রহ শুরু করলাম। লেখাও পেয়ে গেলামÑ মুস্তাফা জামান আব্বাসী, আ.জ.ম ওবায়দুল্লাহ, আসাদ বিন হাফিজ, আবদুল হাই শিকদার, শেখ আবুল কাশেম মিঠুন, মাহফুজুর রহমান আখন্দ, আহসান হাবীব ইমরোজ, ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এদের কাছ থেকে। বাণী নিলামÑ আল মাহমুদ, সাইফুল্লাহ মানসুর, কুমিল্লার মেয়র মনিরুল হক সাক্কু, সসাসের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন, সসাসের নির্বাহী পরিচালক আলমগীর হোসাইনের কাছ থেকে। ঢাকা থেকে স্মারক প্রকাশিত হয়। এ কাজে ঢাকায় অনেকদিন থাকতে হয়েছে। রনি আর ফারুক আমার সাথে থেকে অনেক সহযোগিতা করেছে।
ঐ বছর আর সাংস্কৃতিক উৎসব সম্ভব হয়নি। ২০১২ সালের কথা। ডিসেম্বর মাসের ৩১ তারিখ প্রকাশনা উৎসবের আয়োজন করা হয় শহরের ক্যাপসিকাম হোটেলে। প্রধান অতিথি ছিলেন চিত্রনায়ক শেখ আবুল কাশেম মিঠুন। সভাপতি ছিলেন শিশু চিকিৎসক ও সংগঠক ইকবাল আনোয়ার। সে দিনের প্রধান অতিথির ৪২ মিনিটের জ্ঞানগর্ব আলোচনা উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করেছে।
২০১২ সালে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার রোর্ড মার্চ ছিল ঢাকা টু চট্টগ্রাম। এ উপলক্ষে কুমিল্লায় বিশাল পথসভা হয় পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড ছন্দু হোটেলের সামনে। আগের দিন আমাদের জানানো হয় পথসভায় গান গাইতে হবে। দু’টি গান রেডি করার জন্যে। তখন সঙ্গীত পরিচালক ছিল জয়নাল আবেদীন রনি। রনিকে থিয়েটারের বাসায় আসতে বললাম, সাথে শিল্পীদেরও। রাতে দু’টি গান লিখল এবং সুর দিল রনি। পুরো রাত রিহার্সেল করা হলো। একটা গান হলো রোর্ড মার্চ নিয়ে, আরেকটি ছিল ২০ দলীয় ঐক্যজোটের উন্নয়ন নিয়ে। সকালে আমরা সবাই উপস্থিত হলাম পথসভায়। ৯/১০ থেকেই গান শুরু হলো। প্রথমে কুমিল্লার স্থানীয় শিল্পীরা গান করল কিন্তু এসব গতানুগতিক গানে জনগণ তেমন একটা সায় দেয়নি। এরপর স্টেজে উঠল আমাদের শিল্পীরা। রনি প্রথম গান ধরলÑ ‘আমার মাইজা ভাই সাইজা ভাই কই গেলরে চল যাই চল যাই সবাই রোর্ড মার্চে’। প্রথম গানেই বাজিমাত। জনগণ উল্লাসিত হলো। দুই গানে লাইমাই থিয়েটার হিট। সবার মুখে মুখে লালমাই -এর জয়গান। আমাদের গান শেষে স্টেজে উঠল শিল্পী মনির খান আর শিল্পী ন্যান্সি। কিন্ত তখন ইয়াসিন গ্রুপ আর সাক্কু গ্রুপের মধ্যে কথা কাটাকাটি নিয়ে মারামারি শুরু হয়। যার কারণে ওরা আর গান করতে পারেনি। যারপরনাই আমাদের গানগুলো হিট। এটা আমদের জন্য একটা অর্জন ছিল।
বি-বাড়ীয়ার কসবায় একটি মাহফিল ছিল। আমি, রনি, শামীম ও মুজাহিদ গেলাম। সাথে ছিল হাবিব জীবন ভাই। মাহফিলে প্রধান অতিথি ছিল মাওলানা অধ্যাপক মফিজুর রহমান। আমাদের গান শেষে প্রধান অতিথি উঠল স্টেজে। আলোচনা শুরু করার ১৫ মিনিটের মাথায় দুর্বৃত্তরা মাইকের সব লাইন কেটে দেয় এবং ঐ এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করা হয়। মাহফিল এখানেই সমাপ্ত। কর্তৃপক্ষ রাতে আমাদের আর আসতে দিলো না। রাতে নাকি ঐ রোডে ডাকাতি হয়। সকালে ফজরের নামাজের পর সিএনজি রিজার্ভ করে রওনা দিলাম। কনকনে শীত আর প্রচণ্ড ঠাণ্ডা ছিলো। শীতে একেকজনের হাত-পা বরফের মতো হয়ে গেল। থিয়েটারের বাসায় এসে গরম পানিতে হাত-পা ভিজিয়ে পরিত্রাণ পাই।
আরেকবার চৌদ্দগ্রাম কনকাপৈত একটি মাহফিলে গেলাম। সাথে ছিল রনি, সৌরভ আর সোহেল। মাহফিল শেষে রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষ করে চৌদ্দগ্রাম বাজার আসতে আসতে রাত সাড়ে ১২টা বেজে গেল। কুমিল্লা আসার আর কোনো গাড়ি পাচ্ছি না। দূরপাল্লার গাড়িগুলোতেও ওঠার চেষ্টা করলাম, কিন্তু কোনো সমাধান হলো না। অবশেষে একটা ট্রাকে উঠলাম। কচ্ছপের গতিতে ট্রাক চলা দেখে সবাই চিন্তিত কয়টায় পৌঁছব। ট্রাক এসে নামিয়ে দিলো ছন্দু হোটেলের সামনে। বলল, এক থেকে দেড় ঘণ্টা দেরি হবে। গতি না পেয়ে হাঁটা শুরু করলাম। ছন্দু হোটেল থেকে কোটবাড়ী থিয়েটারের বাসায় হেঁটেই চলে এলাম। বাসায় এসে দেখি রাত সাড়ে ৩টা বাজে।
২০১৪ সালে আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রচার ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক। লাইমাই থিয়েটারের তত্ত্বাবধায়ক ছিলাম। প্লান করলাম কবি মতিউর রহমান মল্লিকের ৪র্থ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বড় আয়োজনে মল্লিক সন্ধ্যা করব। থিয়েটার নিয়ে বসলাম, আইডিয়া ক্রিয়েট করলাম, কিভাবে কি করা যায়? কুমিল্লা সংস্কৃতিকেন্দ্রের সমন্বয়ক এনামুল হক মিলন ভাইকে আহবায়ক করে অনুষ্ঠান বাস্তবায়ন কমিটি করা হয়। অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে মল্লিক স্মারকেও কাজ চলছে। স্মারকের জন্য কবি আল মাহমুদ, আসাদ বিন হাফিজ, মাহফুজুর রহমান আখন্দ, আমিরুল মোমেনীন মানিক, নাসির হেলাল প্রমুখ এর কাছ থেকে লেখা সংগ্রহ করলাম। তখনকার পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে ঊর্ধ্বতন অনেকেই এই অনুষ্ঠান না করার পক্ষে ছিলেন। প্রথমে থিয়েটারের চেয়ারম্যান শাহাদাত ভাইকে রাজি করালাম। বড় বাজেট দেখেও প্রথমে কর্তৃপক্ষ অনুষ্ঠনের অনুমতি দিতে চাচ্ছিল না। বললাম, টাকা-পয়সার চিন্তা করতে হবে না। আমরা কালেকশন করে অনুষ্ঠান করব। নাছোড়বান্দা ছিলাম অনুষ্ঠান করবই। থিয়েটারের তখনকার পরিচালক সাইফুল ইসলাম হিরা আর সহকারী পরিচালক সোহরাব হোসেনকে নিয়ে নেমে গেলাম টাকা কালেকশনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস সম্পাদক আরিফ ভাইও সময় দিলেন আমাদের। ১০/১২ দিনের মাথা আমরা প্রায় লক্ষাধিক টাকা কালেকশন করলাম। মল্লিক সন্ধ্যা যার কারণে অনেকেই যথাসাধ্য সহযোগিতা করেছেন। অনুষ্ঠানের দিন ধার্য হয় ১৬ আগস্ট কুমিল্লা টাউন হল মিলনায়তনে। যদিও মল্লিকের মৃত্যুবার্ষিকী ১২ আগস্ট কিন্তু আমাদের সবকিছু বিবেচনা করে ১৬ আগস্ট অনুষ্ঠান করতে হয়। প্রধান অতিথি ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ, সভাপতি ছিলেন কুমিল্লা সংস্কৃতিকেন্দ্রের সভাপতি ডা. মজিবর রহমান। আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেনÑ শিল্পী মশিউর রহমান, শিল্পী দিদারুল ইসলাম, সসাসের নাট্য সম্পাদক মনিরুল ইসলাম, সাইমুমের সাবেক সহকারী পরিচালক আব্দুল বাতেন। অনুষ্ঠানে বড় পর্দায় প্রদর্শনের জন্য মল্লিককে নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি বানানো হয়। অনুষ্ঠানের আয়োজনও ছিল জাঁকজমকপূর্ণ। ডেকারেশনও ছিল নান্দনিক। যথাসময়ে অনুষ্ঠান শুরু হলো। শুরুতেই মল্লিকের জীবন ও কর্ম ভিত্তিক প্রবন্ধ পাঠ করলেন আব্দুল বাতেন। টাউন হলে অনুষ্ঠান হওয়ায় অনেকেই একটু চিন্তিত প্রশাসনিক বিষয়ে। আলোচনা পর্ব শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হয়। ঠিক এ সময়ে প্রশসনের নজরদারি। মিলন ভাই প্রশাসনের সাথে কথা বলে কর্ণফুলী গ্রুপের মজিব ভাইকে দিয়ে বিষয়টা সমাধান করলেন। পরে আমাদের সিডিউল থেকে ৩টি ইভেন্ট কমিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই অনুষ্ঠান শেষ করতে হয়েছে। কুমিল্লায় মল্লিক সন্ধ্যা ছিলো আমাদের জন্য একটি কষ্টসাধ্য এবং অনেক অভিজ্ঞতা হলো। মল্লিক সন্ধ্যার মতো নান্দনিক একটি অনুষ্ঠান সফল করতে পারায় কুমিল্লার সর্বস্তরের মানুষের কাছে লাইমাই থিয়েটার সেদিন বাহ্বা পেয়েছিল।
২০১৫ সালের জানুয়ারিতে লালমাই থিয়েটারের সেট-আপ প্রোগ্রাম ছিল। সসাসের নাট্য ও মিডিয়া সম্পাদক মনির ভাই এলেন। সেট-আপে রবিউল হাসানকে পরিচালক ও সোহবার হোসেনকে সহ-পরিচালক করে নতুন কমিটি করা হয়। এসময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক থিয়েটারের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা চলমান। পূর্ব নির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী কুমিল্লা পাঠশালা কলেজে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ও পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে মনির ভাইকে প্রধান অতিথি হিসেবে নিয়ে গেলাম। ঐ দিন রাতেই নাঙ্গলকোটের রায়কোটে একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল। অনুষ্ঠানে পারফরম্যান্সের জন্য মনির ভাইকে রেখে দিলাম। রাতে অনুষ্ঠান শেষ করে খাওয়া-দাওয়া করে রওনা দিলাম। ফেরার পথে গ্রামের রাস্তায় আমাদের গাড়ির চাকা একটা গর্তে আটকে গেল। সবাই নেমে উঠানোর চেষ্টা করি। কিন্তু গাড়ি আর উঠছে না। অবশেষে মনির ভাই নেমে ঠেলা শুরু করলেন। মনির ভাই মোটামুটি শক্তিশালী ছিলেন। মনির ভাইসহ সবাই মিলে ঠেলা দিয়ে গাড়ি উঠনো সম্ভব হলো। মেহমান দিয়ে গাড়ি ঠেলানো ঘটনাটি লজ্জার ছিল। সেদিন মনির ভাইয়ের পারফরম্যান্স আর রাস্তায় মজার মজার দুষ্টমিতে সবাই আনন্দ পেল।
২০১৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বসন্তবরণকে কেন্দ্র করে লাইমাই থিয়েটার পিঠা উৎসব এবং পরের দিন ১৪ ফেব্রুয়ারি ঘুড়ি উৎসবের আয়োজন করে। ১ম দিন পিঠা উৎসব থিয়েটারের বাসার ছাদে অনুষ্ঠিত হয়। থিয়েটারের শিশুশিল্পীদের অভিভাবকরা একেকজন একেক রকম পিঠা নিয়ে হাজির হলেন। বাহারী পিঠার বর্ণিল উৎসব। থিয়েটারের কলাকুশলী ও অভিভাবকদের সমন্বয়ে একটি প্রাণবন্ত পিঠা উৎসব অনুষ্ঠিত হলো। পরের দিন ইটাখোলা মুড়ায় থিয়েটারের ঘুড়ি উৎসবের আয়োজন করা হয়। থিয়েটারের শিল্পীরা সবাই নানান রকম রঙ বেরঙের ঘুড়ি নিয়ে হাজির উৎসবে। অনুষ্ঠানিকতা শেষে সবাই ঘুড়ি উড়ানো নিয়ে ব্যস্ত। হঠাৎ করে থিয়েটারের শিশুশিল্পী রিফাত ইটাখোলা মুড়ার উপর থেকে নিচে পড়ে গিয়ে কোমরে প্রচণ্ড ব্যথা পায় এবং কিঞ্চিৎ কেটে যায়। অনুষ্ঠান এখানেই ভণ্ডুল হয়ে গেল। সবাই ওকে তুলে ডাক্তার দেখিয়ে ঠিকঠাক মতো বাসায় পৌঁছে দেয়া হলো। রাতে আমি আর পরিচালক রবিউল রিফাতকে দেখতে বাসায় গেলাম। বাসায় ঢুকতেই রিফাত ইশারা দিয়ে আমাদের বোঝাতে চেষ্টা করল বাসায় যাতে আমরা ওর দুর্ঘটনার বিষয়টা না বলি। বুঝতে পারলাম, ও বিষয়টি বাসায় জানায়নি। শুনালে হয়তো আর থিয়েটারে আসতে দেবে না। এটা ছিলো থিয়েটারের প্রতি রিফাতের ভালোবাসার প্রকাশ।
লাইমাই থিয়েটারের সাথে আমার দীর্ঘদিনের পথচলায় এরকম অনেক ঘটনা আছে যা স্মৃতিচারণ করে শেষ করা যাবে না। থিয়েটারের সব কাজের সাথেই আমার কমবেশি সম্পৃক্ততা ছিল। ২০১০ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর ২০১২ পর্যন্ত থিয়েটারের পরিচালক ছিলাম। শতভাগ সফলতা অর্জন করতে না পারলেও যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি নতুন সংগঠন হিসেবে থিয়েটারকে লক্ষ্যে পৌঁছানোর। পরিচালকের পর থেকে এখন পর্যন্ত থিয়েটারের প্রতিটি কাজেকর্মে সম্পৃক্ত থাকার এবং যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছি। এপ্রিল ২০১৫ থেকে মার্চ ২০১৭ দুই বছর সসাসে থাকাবস্থায়ও থিয়েটারকে নানাভাবে পরামর্শ এবং বিভিন্ন প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করে সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছি। দীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় লালমাই থিয়েটার একঝাঁক সাংস্কৃতিক কর্মী উপহার দিয়েছে। আশা করি, তাদের হাত ধরে আগামী দিনে বাংলাদেশে সুস্থ সংস্কৃতির উর্বর জমির চাষাবাদ হবে। বাংলার জমিন থেকে নোংরা, বেহায়াপনা, অশ্লীল ও অপসংস্কৃতি দূরীভূত হবে।
থিয়েটার আমার প্রাণের সংগঠন। মনে প্রাণে মিশে আছে এই সংগঠনটি। ভবিষ্যতেও যে কোনো কাজেকর্মে থিয়েটারের পাশে থাকতে চাই। সুস্থ সংস্কৃতির নান্দনিক বিকাশ ও নৈতিকতাসমৃদ্ধ সমাজ গঠনে লাইমাই থিয়েটার তার লক্ষ্যপানে এগিয়ে চলুক। এই প্রত্যাশায়...
লেখক : প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, লালমাই থিয়েটার; সাবেক প্রকাশনা সম্পাদক, সমন্বিত সাংস্কৃতিক সংসদ (সসাস)।