31/01/2023
সাম্প্রতিক সময়ে অতি আলোচিত বিষয় বাংলাদেশে হিন্দি ভাষার চলচ্চিত্র আমদানি ও প্রদর্শন করা। এই সমস্যাটার উৎপত্তি মূলত ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময়ে। তৎকালীন দুই পাকিস্তানেই একযোগে ভারতীয় সিনেমা প্রদর্শন বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর দেশ স্বাধীন হলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু তখনকার বাস্তবতায় একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেন। যুদ্ধ বিদ্ধস্ত বাংলাদেশের চলচ্চিত্র কোনভাবেই ভারতের সাথে পাল্লা দিতে পারবে না বুঝেই তিনি বাংলাদেশে তখন ভারতীয় সিনেমা আমদানি বন্ধের আদেশ বহাল রাখেন। অর্থনীতির ভাষায় একে বলে "প্রটেকশন অফ ইনফ্যান্ট ইনডাস্ট্রি" নীতি।
এই পলিসি অর্থনীতিতে খুব কমন। ডাম্পিং বা ট্যারিফ ধার্য্য করেও অনেক ক্ষেত্রে এই পলিসি বাস্তবায়ন করে। যেমন: ধরি বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ভাবে গাড়ি উৎপাদন শুরু হল। টয়োটা কোম্পানি তাদের কারখানা স্থাপন করল। সাথে শুরু করল ওয়ালটন। তখন দেশীয় কোম্পানি ওয়ালটনকে বিশ্বখ্যাত কোম্পানি টয়োটার সাথে পাল্লা দিতে সুবিধা দেয়ার জন্য সরকার বিদেশি কোম্পানি হিসাবে টয়োটার উপরে কিছু কর বা পলিসির বোঝা চাপিয়ে দিয়ে টয়োটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এটাই "প্রটেকশন" নীতিমালা।
বাংলাদেশ এর চলচ্চিত্র শিল্প এই সুবিধা পাচ্ছে গত ৫৩ বছর ধরে। তো একটা কথা বলে যে, "দান গ্রহণ করতেও যোগ্যতা লাগে"। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের সেই যোগ্যতা ও নেই। আশির দশকে বাংলাদেশের প্রযোজক- পরিচালকরা টেপ রেকর্ডার নিয়ে ভারতে যেতেন। সিনেমা হলে যেয়ে হিন্দি সিনেমা পুরোটা রেকর্ড করে এনে বাংলাদেশে এসে 'বমি' করতেন বাংলা ভাষান্তর করে। আমাদের কথিত যত লিজেন্ড আছে চলচ্চিত্র শিল্পের সবই এই প্রডাক্ট। তাই আমাদের সব কালজয়ী নায়ক নায়িকার সিনেমা, বিখ্যাত গান, যেগুলো দেখে আমরা ভাবতাম "ইশ! আমাদের চলচ্চিত্রের সোনালী যুগ ছিল.." সেগুলো সবই আসলে চোরাই মাল। মেধার চর্চা ছিল না বললেই চলে।
ভিসিআর ও স্যাটেলাইট টিভির যুগে এসে আমাদের লিজেন্ড চোরগুলোর চুরি ধরা পড়তে শুরু করে। তখন দুইটা জিনিস শুরু হয়। এক: সিনেমা বাদ, অশ্লীলতা বিক্রি শুরু হয়। দুই: তামিল তেলেগু বা কোরিয়ান সিনেমা যেহেতু এদেশে চলত না, সেগুলো চুরি শুরু হয়। এই চুরি ধরা পরতেও বেশিদিন লাগে নি।
ফলাফল কি হল? চোরাই গল্প, তামিল- তেলেগু সিনেমার ফুটেজ চুরি করা ছবি, নিম্নমানের একই বস্তাপচা অভিনয়, একই চেহারা থেকে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করল। এক শাকিব- অপু জুটিরই নাকি ৭১টা সিনেমা আছে। ভারতের বড় বড় অনেক অভিনেতা ক্যারিয়ারেই ৭১টা সিনেমা করছে কিনা সন্দেহ।
তো এই সময়ে, মূলত ২০০৬ সাল পরবর্তী সময়ে মূলত কি হল? একদল নিম্নমানের, রুচিহীন, অশিক্ষিত লোকজন সিনেমা'র নাম করে জঘন্যতম কিছু ভিডিওকে "সিনেমা" নাম দিয়ে চালিয়ে সিনেমা শিল্পকে একদম ধ্বংস করে দিল। এই কথিত সিনেমার দর্শক শ্রেনী ছিল সমাজের সেই অংশ যাদের বিনোদনের আর কোন মাধ্যম নেই। একেবারেই নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া দরিদ্র কিছু মানুষ। যাদের আর কোন বিনোদনের উৎস নেই। ধীরে ধীরে এরাও মুখ ফিরিয়ে নেয়ার পরে দেশে এখন চলচ্চিত্র শিল্প নেই বললেই চলে। বাংলাদেশে বছরে ২-৩টা যা মানসম্পন্ন সিনেমা হয় তরুণ নির্মাতাদের, সেগুলোও প্রদর্শন করার জায়গা নেই। কারন সিনেমা হল না থাকলে, সিনেমা থাকবে কিভাবে।
ভারতের মালয়ালাম ইন্ডাস্ট্রি বা কন্নড় ইন্ডাস্ট্রির দিকে তাকালে খুব আফসোস হয়। এসব ভাষার মোট ভাষাভাষী সারা পৃথিবী মিলেও ১০ কোটি হবে না। আর আমাদের দেশে জনসংখ্যা ১৮ কোটি। সারা পৃথিবীতে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির ব্যবসা হল ৭-১০ দিনের। মুক্তি পাবার ৭-১০ দিনের মধ্যেই দর্শককে সিনেমা দেখাতে হবে। নইলে পাইরেসি, সোশ্যাল মিডিয়ায় স্পয়লার, স্টোরি লাইন জানাজানি হওয়ার কারনে সিনেমার আকর্ষণ কমে যায়। বাংলাদেশে কি সেই সুযোগ আছে?
একটা সিনেপ্লেক্সে একাধিক স্ক্রিন থাকে। গড়ে প্রতি স্ক্রিনে ২৫০ সিট, প্রতিদিন ৫টা শো যদি ধরি, তাহলে ১২৫০ সিট প্রতি স্ক্রিনে। দিনে যদি ১০ লাখ মানুষকে একটা সিনেমা দেখাতে হয়, সেক্ষেত্রে কমপক্ষে ৮০০ স্ক্রিন লাগবে। ৮০০-৯০০ স্ক্রিন এর জন্য দরকার মোটামুটি ২০০-২৫০ টি সিনেপ্লেক্স। প্রতি জেলায় মিনিমাম একটি করে সিনেপ্লেক্স, বড় শহরে ৩-৪টা করে সিনেপ্লেক্সে, আর দেশব্যাপী মানসম্পন্ন ১০০+ সিংগেল স্ক্রিন সিনেমা হল (এখনকার গুদামঘর টাইপ হল না) হলে এদেশে দিনে ১০ লাখ টিকেট ও বিক্রি করা সম্ভব। তুমুল জনপ্রিয় কোন সিনেমা সেক্ষেত্রে ২-৩ সপ্তাহ চললে ৫০-৬০ লাখ টিকেট বিক্রি ও সম্ভব। কল্পনা করা যায় এদেশে সিনেমার বাজার কত বড়?? এমন হলে এদেশে ২০-২৫ কোটি টাকা বাজেটের সিনেমা বানানো কোন বিষয়??
কিন্তু এগুলো সবই থেমে আছে সেই নিম্নমানের, রুচিহীন, অশিক্ষিত লোকজনগুলোর জন্য। এরা জানে যে কোনমতে যদি বিপুল জনপ্রিয় হিন্দি সিনেমা, হলিউডের সিনেমা মুক্তির দিনই বাংলাদেশে মুক্তি পেতে শুরু করে, তাহলে আর এই বস্তাপচা এফডিসি মার্কা অখাদ্য দেখার জন্য বস্তির টোকাইদের ও পাওয়া যাবে না। তখন ওসব দর্শক ও হিন্দি সিনেমা দেখতে যাবে। আর এই তুমুল জনপ্রিয় মুভিগুলো মুক্তি পেলে দেশে অনেকগুলো সিনেপ্লেক্স হবে। মানসম্মত সিংগেল স্ক্রিন হল হবে যেখানে মানসম্মত স্ক্রিন ও সাউন্ড দিয়ে হিন্দি সিনেমাগুলো দেখানো যাবে। এই রকম যদি সিনেমার পরিবেশ হয়, তাহলে ভাবুন তো প্রযোজকরা ২০-২৫ কোটি টাকা লগ্নি করলে কোন পরিচালকদের পিছনে করবে?? ঝন্টু- ফন্টু, নকল খোকন এদের পিছনে? নাকি অমিতাভ রেজা, আশফাক নিপুন, মেজবাউর রহমান সুমন, অনম বিশ্বাসদের পিছনে?
বাস্তবতা হল এইরকম সুদিন এলে এফডিসি মার্কা যাত্রাপালা ক্যাটেগরির সিনেমা সংশ্লিষ্ট সব ভিক্ষা করে খাওয়া লাগবে। একই বস্তাপচা জিনিস দর্শককে গেলানোর দিন শেষ হবে।
তাই বাংলাদেশ এর চলচ্চিত্র শিল্পের স্বার্থে, সিনেমার স্বার্থে এদেশে উন্নত মানের ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানি শুরু করা উচিত। সংখ্যা লিমিটেড হোক প্রয়োজনে। বছরে ২০টা করেই আসুক হিন্দি, তামিল, তেলেগু, মালয়ালাম ছবি। সাথে আসুক একই সংখ্যক জনপ্রিয় হলিউড সিনেমা। মুক্তবাজার করে দেয়া হোক। তখন এদের সাথে কমপিট করে যদি বছরে ২০টা ভাল বাংলা সিনেমা ও হয়, তবুও অনেক ভাল। সেই ২০টা সিনেমাই হবে মানসম্মত। জয় হোক আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের।
সংগৃহীত